রাস্তার কিনারে এসে একটু থামলেন রীনা খাতুন। পার হয়ে ওপাশে যাবেন। প্রথমে ডানে তাকালেন, তারপর বামে; আবারও ডান, আবারও বামে। সতর্ক চাহনি, উদ্বিগ্ন মন। কোলে যে তার ছোট্ট মেয়ে।
মালবোঝাই বিশাল ট্রাক চলে গেল তার দানবীয় গতিতে। পা রাখলেন তিনি রাস্তায়। চঞ্চল যাত্রা, শঙ্কিত পা। মাঝরাস্তায় এলেন। পেছন দিয়ে এক দম্পতি পাশ কাটলেন মোটরসাইকেলে। ততক্ষণে পার হয়েছেন আরও একটু। ওপাশে রাস্তায় দাঁড়ানো একটা লম্বা বাস। তার পেট বরাবর এসে ডানে ঘুরলেন তিনি। সামনে এসে পৌঁছলেন সেটার, পারও হয়ে যাচ্ছিলেন প্রায়। ঠিক তখনই চলতে শুরু করে থেমে থাকা বাসটি। সরাসরি ধাক্কা দেয় মাকে, ছিটকে পড়ে যায় কোলের মেয়েটি। তবুও থামে না বাস। ধাক্কা লাগে আবার। তৃতীয়বারের মতো ধাক্কায় ছিটকে পড়েন মাও। ততক্ষণে পেছনের চাকায় আঘাত পেয়েছে ছোট্ট শিশু। হেলেদুলে বাস চলে যায় তার নিরাপরাধ ভঙ্গিতে আর আট মাস বয়সী আকিফাকে আঁকড়ে তুলে রীনা খাতুনের কলজে-চেরা চিৎকার।
ঘটনাটি গত মঙ্গলবারের। দুপুর পৌনে ১২টায়। কুষ্টিয়ার চৌড়হাস মোড়ে।
মা-মেয়েকে উদ্ধার করে আশপাশের মানুষ তখন একটি থ্রি হুইলারে তুলে নিয়ে যান কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে। রীনার কোমরে আঘাত, আকিফার অবস্থার অবনতি। স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, রাতেই। সঙ্গে আসেন তার বাবা। ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় আকিফাকে। কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করেও চিকিৎসক বাঁচাতে পারেননি তাকে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মৃত্যু হয় তার। সে সময় অন্য রোগী ও স্বজনদের বেশিরভাগই ঘুমাচ্ছিলেন। বাবা-মায়ের তীব্র আর্তনাদ আর চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় তাদের।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি সকালে ওয়ার্ড থেকে মর্গে নেওয়া হয়। সে সময় তার মা রীনা ওয়ার্ডেই অবস্থান করছিলেন। দুপুর ১২টার দিকে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, তিনি বেডে বসে কাঁদছেন। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, পোড়াদহে যাওয়ার জন্য তিনি মেয়েকে কোলে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। বাসটি থেমে থাকায় বাসের সামনে দিয়ে পার হচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু বাস হর্ন না দিয়েই চলতে শুরু করে। বাসের প্রথম ধাক্কায় তার কোল থেকে আকিফা ছিটকে পড়ে যায় রাস্তার ওপর। ধাক্কা খাওয়ার পর তিনি একটু সামনে এগিয়ে গেলে আরও দু'বার তাকে ধাক্কা দেয় বাসটি। এর পরই
তিনি রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে চিৎকার করেন। পড়ে গিয়েও মেয়ের দিকে চোখ রেখেছিলেন। রীনা বলেন, 'বাসটি যদি প্রথম ধাক্কা দেওয়ার পর থামত, তাহলে আমার মেয়েকে হারাতে হতো না। বাসের পেছনের চাকা আমার মেয়ের মাথার পাশে ঘষা লেগে চলে যায়। এতে ওর মাথায় আরও আঘাত লাগে।'
মর্গে যখন মেয়ের লাশ চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করছিলেন, তখন বাবা হারুনসহ স্বজনরা বাইরে অবস্থান করছিলেন। হারুন বলেন, 'আমার মেয়ের দুর্ঘটনার দৃশ্য সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়েছে। ওই ফুটেজ সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রীকে দেখার জন্য অনুরোধ করছি। যোগাযোগমন্ত্রী বলুক, এটি ইচ্ছাকৃত কি-না। এটি দুর্ঘটনা নয়। চালক ইচ্ছা করে চাপা দিয়েছে। আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। চালকের শাস্তি চাই।'
দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মর্গ চত্বরেই লাশের গোসল করানো হয়। এরপর কাফন মোড়ানো অবস্থায় বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয় মেয়ের লাশ। চারদিকে কান্নায় ভেঙে পড়েন আশপাশের সবাই।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘাতক বাসটি রাজশাহী থেকে ফরিদপুরে চলাচল করে। বাসের চালক, হেলপার ও মালিকের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে বাস জব্দ ও চালককে আটক করতে পারেনি তারা।
এদিকে দুর্ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ওই বাসের চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার শাপলা চত্বরে মানববন্ধনও করেছেন বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, 'শিশুটির মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ কারণে ব্রেনে রক্ত জমাট বেঁধে যায় তার।'
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, 'তিনি নিজেও দুর্ঘটনার ফুটেজটি দেখেছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, ড্রাইভার ইচ্ছা করেই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। থানায় জিডি হয়েছে। জিডি অনুযায়ী তদন্ত চলছে। ঠিকানা পাওয়া গেছে বাসের চালক ও হেলপারের। পরিবারের সদস্যরা লাশ নিয়ে ব্যস্ত আছে। তারা মামলা করার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘাতক বাসচালক খোকনের বাড়ি ফরিদপুরে। বাস জব্দ করতে না পারায় রুট পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক আছে কি-না তা জানতে পারেনি পুলিশ।
উল্লেখ্য, ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যুর পর সড়কের নিরাপত্তাসহ নয় দফা দাবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্রছাত্রীরা। এর পরও সড়কের নিরাপত্তায় চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি এখনও। প্রতিদিনই ঘটছে মর্মন্তুদ ঘটনা।
-সময়ের সংলাপ২৪/ডি-এইচ
