ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি সুফিয়া কামাল হলের ২০ ছাত্রীকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতেহল ত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মধ্যরাত পর্যন্ত হল কর্তৃপক্ষ ছাত্রীদের একের পর এক বের করে দেয়।
ছাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের (অভিভাবক) কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়া হয়। ফলে অভিভাবকরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
হল থেকে বের করে দেয়া ছাত্রীদের কয়েকজন হলেন, শারমীন শুভ (গণিত, তৃতীয় বর্ষ), কামরুন্নাহার লিজা (থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ, চতুর্থ বর্ষ) ও পারভীন (গণিত)।
এছাড়া রাত সাড়ে ১২টার দিকে রিমি নামের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীর বাবাকে ডেকে আনে হল কর্তৃপক্ষ। রাত সোয়া ১টায় হল থেকে রিমিকে ছাড়াই বের হন তার বাবা ফারুক হাওলাদার। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হল প্রশাসন বলেছে, রিমি আগে আন্দোলনে জড়িত ছিল। আর যেন কোনও আন্দোলনে সে না যায়।’
তিনি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি হননি। হলে ঢোকার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে হল থেকে একজন মহিলা ফোন দিয়ে আসতে বলেন। আমি বললাম, আমার বাসা ধামরাই। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে আসব? তখন ওই মহিলা বলেন, আপনাকে আসতেই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেন ডাকা হলো আমি কিছু বলতে পারব না। দেখি তারা কী বলে।’
রাত ১২টার দিকে শারমীন শুভকে তার বাবা এসে হল থেকে নিয়ে যান। এসময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তিনি কিছু বলেননি। পরে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘হল প্রশাসন থেকে আমাদের কোনও কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা কিছু বলতে পারব না।’
এর আগে ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনায় গঠিত হলের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধেও সাক্ষাত্কার গ্রহণের নামে ছাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান এশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘটনায় সম্পৃক্তদের ডেকে নিয়ে এমন হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশি্লষ্টদের। ছাত্রীদের ডেকে হল ত্যাগে বাধ্য করা, মুঠোফোন জব্দ করা, মামলায় জড়িয়ে দেয়ার হুমকি এবং অভিভাবকদের ফোন দিয়ে হয়রানি ইত্যাদি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে হলের এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর বড়ভাই আবদুল আউয়াল জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার বোনকে ফোন দেন। এ সময় ফোনটি রিসিভ করেন এক শিক্ষিকা। ওই শিক্ষিকা বলেন, ’হলে সমস্যা হয়েছে। আপনার বোনকে হল থেকে নিয়ে যান, তার ফোন জব্দ করা হয়েছে।’
আবদুল আউয়াল জানান, তিনি ওই শিক্ষিকাকে অনুরোধ করেন তার বোনকে ফোনটি দেয়ার জন্য। পরে বোন ফোন রিসিভ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথা বলেন। এ সময় সে তাকে বাসায় নিয়ে যেতে অনুরোধ করে ফোনটি কেটে দেন। এরপর থেকে আর তার বোন ফোন রিসিভ করছে না।
তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বোন যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে তার বিচার হতেই পারে কিংবা আমাদের কাছেও অভিযোগ জানাতে পারে। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করছে না কেন? আমি আমার বোনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।’
ঘটনার বিষয়ে জানতে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমানকে ফোন করা হয়। ফোনে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কল কেটে দেন তিনি। এরপর একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে ঢাবি উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘হল কর্তৃপক্ষ মেয়েদের অভিভাবক। তারা যেকোনও বিষয়ে মেয়েদের তলব করার অধিকার রাখে। এ হিসেবে তাদের তলব করা হচ্ছে, হয়রানি করা হচ্ছে না।’
হল থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো গুজব ছড়ানো হচ্ছে। একটি চক্র এসব গুজব ছড়ানোর পেছনে কাজ করছে।’
ওই হলের কয়েকজন ছাত্রী সাংবাদিকদের জানান, হল প্রশাসন ছাত্রীদের ডেকে নিয়ে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাদের মোবাইল ফোন আটকে তা চেক করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, অন্তি নামে আমার এক বান্ধবীকে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা তাকে ফোন দিলে তার ফোনটি হলের এক ম্যাম ধরে আমাকে জানান, অন্তিকে ফোন দেওয়া যাবে না।
ছাত্রীরা অভিযোগ করে জানান, বিভিন্ন বিভাগের মেয়েরা এ সময় হলের মাঠে জড়ো হন। কর্তৃপক্ষতাদের নাম-ঠিকানা জোগার করে মাঠ ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, এর আগে সুফিয়া কামাল হল কর্তৃপক্ষ ছাত্রী লাঞ্ছনাসহ ১১ এপ্রিল সংঘটিত ঘটনা তদন্তেপাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি ছাত্রী লাঞ্ছনার অভিযোগ থেকে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে অব্যাহতি দিয়ে উল্টো ২৬ ছাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। অথচ এশা ছাত্রীদের ডেকে নিয়ে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি ও হয়রানি করলেও তাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
-সময়ের সংলাপ২৪/ডি-এইচ